বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬

ডিম ও মুরগির মাংসের দরপতন রোধে সরকারের নিকট সহায়তার আবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:৪৪ অপরাহ্ণ
 ডিম ও মুরগির মাংসের দরপতন রোধে সরকারের নিকট সহায়তার আবেদন

গত প্রায় এক বছরের বেশি সময় ডিম ও মুরগির মাংসের বাজারে দরপতনের কারণে প্রান্তিক খামারিসহ পোল্ট্রি শিল্প সংশিষ্ট প্রতিটি খাতের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে। বিভিন্ন সময়ে খামার, ফিড মিল, ব্রিডার ফার্ম বন্ধ হয়ে গেছে; কমেছে উৎপাদন। এ অবস্থা চলতে থাকলে পোল্ট্রি শিল্পকে রক্ষা করাই অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এত দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম ও বিশাল বিনিয়োগে যে পোল্ট্রি শিল্প সকলে মিলে আমরা দাঁড় করিয়েছি তা পুরোপুরি টিকে থাকতে পারবে না।

গত অক্টোবর মাস থেকে ডিম ও মুরগির মাংসের দাম নিম্নমুখী। গত কিছুদিন যাবত রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতিটি ডিম ৮.৮০ টাকা থেকে ৯ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। ঢাকা ও গাজীপুরসহ পাশ্ববর্তী এলাকায় খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিম বিক্রি হয়েছে গড়ে ৭.৮৭ টাকায়।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর প্রতিটি ডিমের মূল্য নির্ধারণ করেছে- খামার পর্যায়ে ১০.৫৮ টাকা, পাইকারিতে ১১.০১ টাকা ও খুচরা পর্যায়ে ১১.৮৭ টাকা। প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে ১০,১৯ টাকা। সে হিসাবে প্রতিটি ডিম বিক্রি করে খামারির লোকসান হচ্ছে গড়ে প্রায় ২ টাকা থেকে ২.৩০ টাকা। ডিমের দৈনিক উৎপাদন সাড়ে ৫ কোটি পিস ধরলে, গত এক মাসে খামারির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০০ কোটি টাকা থেকে ৩৪৮ কোটি টাকা।

একইভাবে প্রতি কেজি ব্রয়লার ও সোনালী মুরগির মূল্য নির্ধারণ করেছে- খামার পর্যায়ে ১৬৮.৯১৩ ২৬০.৭৮ টাকা। কিন্তু বর্তমানে খামার পর্যায়ে ব্রয়লার ও সোনালী মুরগির বিক্রি হয়েছে যথাক্রমে ১২২ টাকা ও ১৭৫ টাকা কেজি। অর্থাৎ প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগিতে খামারির লোকসান হচ্ছে ৪৬.৯১ টাকা।

লোকসান সামাল দিতে না পেরে অনেক খামারি মুরগি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন- যা অত্যন্ত আশংকাজনক। বন্ধ হচ্ছে অনেক লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগির খামার। এভাবে খামার বন্ধ হতে থাকলে অচিরেই ডিম ও মুরগির মাংসের উৎপাদনে মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিবে। সরবরাহ ঘাটতি হলে, বাড়বে ডিম ও মাংসের দাম- যা ভোক্তার ক্ষতির কারণ হবে।

প্রসঙ্গত। উল্লেখ্য যে, সরকার ডিমের 'সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য' নির্ধারণ করলেও 'নূন্যতম মূল্য' নির্ধারণ করেনি। ডিম বা মাংসের দাম সাময়িক বৃদ্ধি পেলে সঙ্গত। কারণেই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরসহ বাজার তদারকি সংস্থাগুলো সক্রিয় হন কিন্তু দরপতনে কোনো সংস্থার পক্ষ থেকেই খামারিদের স্বার্থে কার্যকর কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় না।

এভাবেই বছরের অধিকাংশ সময়ই ডিম ও মুরগির দরপতন ঘটছে এবং পরবর্তীতে সরবরাহ সংকটের কারণে ডিম ও মাংসের বাজার অস্থিতিশীল হচ্ছে।

বিশ্বের অনেক দেশে এ পরিস্থিতি সামাল দিতে অফ-সিজনে খামারিদের ভর্তুকি প্রদান করা হয়ে থাকে। তাছাড়া অতিরিক্ত ডিম সংরক্ষণে কেন্ডস্টোরেজে ব্যবস্থাও করা হয়। প্রতিবেশী দেশেও এ ধরনের শতাধিক কোল্ডস্টোরেজ রয়েছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে কোল্ডস্টোরেজে ডিম সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়নি বরং বিভিন্ন সময় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কোল্ড স্টোরেজে অভিযান পরিচালনা করেছে।

এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, এক ডজন ডিম বিক্রি করে খামারি ২০-২৬ টাকা লোকসান গুণলেও মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা ঠিকই মুনাফা করছে ২০-২৪ টাকা। এক কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি করে খামারির লোকসান হচ্ছে ৪৫-৪৭ টাকা এবং মধ্যস্বত্ত্বভোগী মুনাফা করছে ৪০-৪২ টাকা। অর্থাৎ পরিস্থিতি যাই হোক না কেন মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের কখনই লোকসান হয় না।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় খামারিদের ঝরে পড়া রোধে নিম্নোক্ত প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হলো।

১. ডিম ও মাংসের 'সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য' নির্ধারণের পাশাপাশি 'নূন্যতম মূল্য' নির্ধারণ করা।

২. ডিম ও মাংসের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন বিষয়ক কৌশলপত্র প্রণয়ন করা।

৩. অফ-সিজনে তৃণমূল খামারিদের জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থা করা।

৪. ডিম ও মুরগির মাংস সংরক্ষণে কোল্ডস্টোরেজ ব্যবহারের অনুমোদন দেয়া এবং এ ধরনের শিল্প স্থাপনে স্বল্প সুদে ঋণ   প্রদানের ব্যবস্থা করা।

৫. ডিম ও মুরগির মাংস রফতানির ব্যবস্থা করা।

৬. বাজার মনিটরিং জোরদার করা।

খামারিদের বর্তমান দুরবস্থার কথা বিবেচনা করে ভোক্তাদের স্বার্থে জরুরিভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

Read more — জাতীয়
← Home