বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬

সহ্য হয়নি দুই এনজিওকর্মীর আলটিমেটাম

স্ত্রী-সন্তানদের হত্যা করে আত্মহত্যা!

উত্তরা প্রতিবেদক ১৯ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৪৩ পূর্বাহ্ণ
সহ্য হয়নি দুই এনজিওকর্মীর আলটিমেটাম
মিনারুল ইসলাম ও তার তার স্ত্রী মনিরা বেগম। ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বামুনশিকড় গ্রামের হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো এলাকার মানুষ স্তম্ভিত। ঋণের চাপে দিশেহারা হয়ে স্ত্রী-সন্তানদের হত্যার পর মিনারুল ইসলাম আত্মহত্যা করেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মিনারুলের লাশের পাশে পাওয়া চিরকুট অনুযায়ী তেমন ধারণাই পাওয়া যায়।

দিনমজুর মিনারুল ইসলাম ছাড়াও নিহত তিনজন হলেন তার স্ত্রী মনিরা বেগম (৩২), ছেলে মাহিন (১৩) ও দেড় বছরের শিশুকন্যা মিথিলা।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ আগস্ট বিকেলে একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) দুই কর্মকর্তা মিনারুলকে তার ঋণ পরিশোধের জন্য চাপ দেন। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ১৫ আগস্ট সকাল ৮টার মধ্যে সব টাকা পরিশোধ করতেই হবে। এর ঠিক পরদিন সকালে মিনারুলের ঘর থেকে তার, স্ত্রী ও দুই সন্তানের নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় পাশেই পাওয়া দুই পাতার চিরকুটে লেখা ছিল, ‘আমরা মরে গেলাম, রেনের (ঋণের) দায়ে আর খাওয়ার (খাবারের) অভাবে।’ তবে আলটিমেটাম দেওয়ার বিষয়টি জানা গেলেও তারা কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মী, তা জানাতে পারেননি স্থানীয়রা।

মৃত্যুর আগে দিনভর টাকা সংগ্রহ করার চেষ্টা

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৃত্যুর আগের দিন অর্থাৎ ১৪ আগস্ট মিনারুল ইসলাম দিনভর বিভিন্ন স্থানে টাকা জোগাড়ের জন্য ছুটে বেড়ান। সন্ধ্যার পর তিনি স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে বসে ছিলেন এবং একপর্যায়ে নিজের বাবাকে ফোন করে বলেন, ‘আমার জন্য আপনাকে আর ছোট হতে হবে না, মানুষের কাছে খারাপ হতে হবে না। আমি খুব ধারদেনার মধ্যে আছি, আমাকে মাফ করে দিয়েন।’

ঋণ ছিল মাত্র ২,২৫০ টাকা, কিন্তু…

পুলিশ মিনারুলের ঘর থেকে উদ্ধার করে একটি কিস্তির বই, যা ছিল এনজিও টিএমএসএসের। বই দেখে জানা গেছে, মিনারুল এক বছর আগে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন এবং নিয়মিতভাবে তা পরিশোধও করছিলেন। অবশিষ্ট ছিল মাত্র ২ হাজার ২৫০ টাকা। তবে ধারণা করা হচ্ছে, শুধু টিএমএসএস নয়, তিনি আরও কয়েকটি এনজিও কিংবা স্থানীয় ব্যক্তি ও সংস্থার কাছ থেকেও ঋণ নিয়েছিলেন। সেগুলোর চাপই হয়তো তার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।

ঋণের ফাঁদে বন্দি একটি গ্রাম

রাজশাহীর খড়খড়ি বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বামুনশিকড় গ্রাম। গতকাল রবিবার ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রায় আড়াই শ পরিবারের বসবাস। অধিকাংশ বাসিন্দাই দিনমজুর, রিকশাচালক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। শিক্ষার হার অত্যন্ত কম হওয়ায় এখানকার মানুষ ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকেন। গ্রামীণ ব্যাংক, টিএমএসএস, আশা, ব্র্যাক, কারিতাস, শাপলা গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা, শবফুলসহ বেশ কিছু এনজিও এখানে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব এনজিওর কর্মীরা এক প্রকার প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ঋণ দিয়ে থাকেন এবং সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাপ প্রয়োগ করেন। কেউ এক এনজিওর ঋণ শোধ করতে গিয়ে আরেক এনজিও থেকে ঋণ নেন, যা শেষ পর্যন্ত ঋণের এক ঘূর্ণাবর্তে পরিণত হয়। ফলে অনেকে চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। এর আগেও বেশ কয়েকজন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তবে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুতে বিষয়টি বেশি আলোচনায় এসেছে।

এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া এক ব্যক্তি বলেন, ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিলে সঞ্চয়সহ সপ্তাহে ১ হাজার ৩০০ টাকা কিস্তি দিতে হয়। ৪৬ কিস্তিতে তা পরিশোধ করতে হয়। আর মাসিক ভিত্তিতে নিলে মাসে ১০ হাজার টাকা করে কিস্তি দিতে হয়।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আগে বেশ কয়েকটি এনজিও থেকে ঋণ নিলেও সবগুলো পরিশোধ করে এখনো দুটি এনজিওর ঋণ আছে। এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই ঋণ নেওয়া আছে।

মোছা. রোজিনা বেগম নামে স্থানীয় এক নারী বলেন, পরিশোধের ক্ষমতা আছে কি না, তা খুব এটা দেখাই হয় না। মাসে ১৫ হাজার টাকা আয় করা ব্যক্তি যদি ১০ হাজার টাকা কিস্তি দেয়, তাহলে তার সংসার কীভাবে চলবে? কিন্তু সহজেই ঋণ পেয়ে অনেকেই নেশা করে ও জুয়া খেলে টাকা শেষ করে ফেলে। পরে পরিশোধের চাপ এলে আরেকটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আগের এনজিওর কিস্তি শোধ করে। এতে ঋণের বোঝা থেকে আর বের হতে পারে না। পরে ভোর থেকে রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত এনজিও কর্মীরা ঋণগ্রহীতাদের তাড়া করে ফেরেন।

ওই গ্রামের বাসিন্দা রিকশাচালক রাকিবুল ইসলাম বলেন, “মিনারুল খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু ধারদেনার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। ঘটনার আগের দিন রাত ৮টা-সাড়ে ৮টার দিকে মিনারুল আমাদের সঙ্গে বসে ছিলেন। এর আগে তিনি সারা দিন টাকার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ছুটে বেড়িয়েছেন। পরে তিনি তার বাবাকে ফোন করে বলেন- ‘আব্বা আমার টাকা-পয়সা ম্যানেজ করা লাগবে না, আমার ল্যাগি (জন্য) আপনি অনেক নত হয়েছেন, ছোট হয়েছেন, মানুষের কাছে খারাপ হয়ে গেছেন। আমার লাইগি (জন্য) আর কোনো ধান্ধা-পান্দা (চেষ্টা) করা লাগবে না। আমি খুব ধারদেনার মধ্যে আছি, আমাক মাপ-ঝোক (মাফ) করে দিয়েন।”

তিনি আরও বলেন, ‘ফোন কেটে দেওয়ার পর মিনারুল আমাদের বলেন- তোরা ছোট ভাই হস, জীবনে ভুল-টুল করলে মাফ-টাফ করে দিস। জীবনের কিছু একটা করব। যদিও এই কথাটা প্রায়ই বলত। কিন্তু ওই দিন যে হঠাৎ জিনিসটা (আত্মহত্যা) করে ফেলবে কেউ কল্পনাতেও নিয়ে আসতে পারেনি।’

এক প্রশ্নের উত্তরে রাকিবুল বলেন, মিনারুল ধারদেনার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন, কেউ হয়তো টাকা পাইত। চাপাচাপি করছিল। কেউ টাকা পেলে তো ফেলে রাখবে না। কয়দিন ফেলে রাখবে? তাই মানুষের চাপাচাপির কারণে হয়তো এই পথ বেছে নিয়েছে।  

মিনারুলের বাবা রুস্তম আলী জানান, সাত-আট বছর আগে মিনারুলের ঋণ পরিশোধের জন্য তিনি জমি বিক্রি করেন। জমি বিক্রি করে তার ঋণ পরিশোধ করেছিলেন। মিনারুল পরে আবার ঋণগ্রস্ত ছিল কি না, তা তিনি জানেন না।

ঋণ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে টিএমএসএস খড়খড়ি শাখার ম্যানেজার মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘মিনারুল ইসলাম প্রায় এক বছর আগে টিএমএসএস থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নেন। তিনি সব সময় ঠিকভাবেই কিস্তির টাকা পরিশোধ করে আসছিলেন। ৩০ কিস্তি পার হওয়ার পর সবাই দ্রুত পরিশোধের জন্য আগ্রহী হলেও তার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন হয়। এতে তাকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে মেডিকেল আছি।’ মাত্র ২ হাজার ২০০ টাকার মতো বকেয়া থাকায় ও মেয়ে অসুস্থ বলায় তাকে আর টাকার বিষয়ে বলা হয়নি। পরে হঠাৎ তার মৃত্যুর খবর জানতে পেরেছি।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বামুনশিকড় গ্রামে প্রায় ৮০ জন ব্যক্তি আমাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। তবে আমাদের কিস্তি সাপ্তাহিক ও মাসিক হওয়ায় তেমন চাপ কেউ অনুভব করেন না। কিন্তু অন্য প্রতিষ্ঠানের মেয়াদি ঋণ যদি কেউ নিয়ে থাকেন, তাহলে হঠাৎ করে অনেক টাকার চাপ পড়ে। এতে অনেকে হতাশার মধ্যে পড়তে পারেন।’

মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মালেক বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে ধারদেনার চাপে হতাশাগ্রস্ত হয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে এখন পর্যন্ত তদন্তে জানা গেছে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মিনারুলের ছোট মেয়ে মিথিলা প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ ছিল। তার চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা প্রয়োজন ছিল। সেটা জোগাড় করার চেষ্টা করেছে। তার বাবার কাছেও টাকা চেয়েছে। কিন্তু টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে সে নানা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে। পরে কিছু টাকা সংগ্রহ হলেও সেটা আবার খরচ হয়ে যায়। এই চাপের পাশাপাশি বর্তমানে বৃষ্টিসহ বৈরী আবহাওয়ার কারণে হাতে কাজ ছিল না। ফলে সে দিনমজুর হিসেবেও কাজ পাচ্ছিল না। এতে সে আরও হতাশ হয়।

পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাঈদ আলী মোর্শেদ বলেন, আগের ঋণগুলো জমি বিক্রি করে পরিশোধ করার পর সে ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু তার ছোট বাচ্চার অসুস্থতার কারণে সে আবারও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পাশাপাশি এলাকায় মাদক ও জুয়ার বিস্তার ঘটেছে, যা থেকে বের করতে এই এলাকায় শিগগিরই সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘তিন দিন আগে মিনারুল আমার কাছে গিয়ে বলেন, বাড়িতে খাবার নাই। টাকা দেন। আমি ২ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। আগে তাস খেলতেন। পরে নাকি সে খেলা বাদ দিয়েছিলেন।’

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার বামুনশিকড় গ্রামে একই পরিবারের চারজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় পাশেই পাওয়া দুই পাতার চিরকুটের এক পাতায় লেখা আছে, ‘আমি মিনারুল নিচের যেসব লেখা লেখব। সব আমার নিজের কথা লিখে জাছি (যাচ্ছি) এই কারণে, আমরা চারজন আজ রাতে মারা জাবো (যাবো)। এই মরার (মৃত্যুর) জন্য কারও কোনো দস (দোষ) নেই। কারণ লেখে না গেলে বাংলার পুলিশ কাকে না কাকে ফাসা (ফাঁসিয়ে) টাকা খাবে। আমি মিনারুল প্রথমে আমার বোকে (স্ত্রী) মেরেছি। তারপর আমার মাহিনকে মেরেছি। তারপর আমার মিথিলাকে মেরেছি। তারপর আমি নিজে গলাতে ফাঁস দিয়ে মরেছি। আমাদের চার জোনের মরা মুখ যেন বাপের বড় ছেলে ও তার বো বাচ্চা না দেখে। এবং বাপের বড় ছেলে যেনো জানাজায় না যায়। আমাদের চার জনকে কাফন দিয়ে ঢাকতে আমার বাবা টাকা যেন না দেয়। এটা আমার কসম (ইতি মিনারুল) আচছালামু আলাই কুম।’

চিরকুটের অপর পাতায় লেখা আছে, ‘আমি নিজ হাতে সবাকে মারলাম এই কারণে যে, আমি একা জদি (যদি) মরে যাই, তাহলে আমার বো (বৌ), ছেলে, মেয়ে কার আশায় বেচে (বেঁচে) থাকবে। কষ্ট আর দুঃখ ছাড়া কিছুই পাবে না। আমরা মরে গেলাম, রেনের (ঋণের) দায়ে আর খাওয়ার (খাবারের) অভাবে। এত কষ্ট আর মেনে নিতে পারছি না। তাই আমাদের (আমরা) বেচে থাকার চেয়ে মরে গেলাম, সেই ভাল হলো। কারও কাছে কিছু চাই (চাইতে) হবে না। আমার জন্নে (জন্যে) কাওকে মানুসের কাছে ছোট হতে হবে (না) আমার বাবা আমার জন্য, অনেক লোকের কাছে ছোট হয়েছে আর হতে হবে না। চিরদিনের জন্য চলে গেলাম। 

আমি চাই সবাই ভাল থাকবেন। 

ধন্যবাদ’

Read more — সারাদেশ
← Home