বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬

আমানত বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিন

মূল্যস্ফীতির চাপে শ্লথ ব্যাংক খাত

উত্তরা ডেস্ক ২২ আগস্ট ২০২৫, ০৫:৩৬ অপরাহ্ণ
আমানত বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিন

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থনীতির অগ্রগতি অনেকটা শ্লথ হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর বেশির ভাগ সময়ই আমানত প্রবৃদ্ধিতে নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দীর্ঘ চার মাস আমানতের প্রবৃদ্ধি কমলেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমানতের প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৮ শতাংশের ওপরে ওঠে। পরের মাসে তা আবার ৭ শতাংশে নেমে যায়। মার্চ-এপ্রিলে তা ৮ শতাংশ থাকলেও মে মাসে আবার ৭ শতাংশে নেমে যায়। সবশেষ জুনে আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের আমানতে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে অর্থনীতির বিভিন্ন সেক্টর সংস্কারে মনোযোগী হয়েছে। ব্যাংক খাতের গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে এবং মানুষের আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুনে আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। তবে এর পর থেকেই এই প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০২৪ সালের আগস্টে তা নেমে দাঁড়ায় মাত্র ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে, যা ছিল আগের ১৮ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামের সমন্বিত বৃদ্ধির প্রভাবে টানা তিন মাসের নিম্নমুখী প্রবণতা থেমে জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি আবারও বেড়ে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। 

ব্যাংকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাধারণত মূল্যস্ফীতি কমলে আমানত বাড়ে। কিন্তু গত কয়েক মাসে তা হচ্ছে না। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও বিনিয়োগ সেভাবে হচ্ছে না। এতে করে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে না। মানুষের আয়ও বাড়ছে না। যা তাদের সঞ্চয়ের ক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলছে। আমানত প্রবৃদ্ধি উন্নতি না হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি এখন অনুষ্ঠানে বলেছেন, মূলত ডলার পাচার হওয়ার কারণেই সেই পরিমাণ টাকা ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে চলে গেছে। তাতে টাকার সংকট তৈরি হয়েছে। এ জন্য ব্যাংকগুলো আমানতের উচ্চ সুদ দিয়েও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারছে না। 

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে চলমান অনিশ্চয়তা এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠনের প্রভাবে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে ধরে রেখেছে। ফলে আমানত অস্বাভাবিক হারে কমে যায়। আর ব্যাংকের বাইরে রাখা টাকার পরিমাণ বাড়ছিল। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা উদ্যোগে ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকায় সঞ্চয় করার সক্ষমতা হারিয়েছে। এতে ব্যাংক আমানত প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না। আমানত না বাড়ার কারণে বিনিয়োগও বাড়ছে না। ফলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হবে। তিনি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর জোর দেন। 

ব্যাংক খাতের ওপর আস্থাহীনতায় মানুষের হাতে টাকা রাখার পরিমাণ বাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ইসলামি ধারার পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার ঘোষণার পর আমানতকারীরা তাদের আমানতের সুরক্ষার অভাববোধ করতে থাকেন। এরপর আমানত তোলার হিড়িক পড়ে যায়। এভাবে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নেন গ্রাহকরা। এটি ব্যাংক খাতের ওপর গ্রাহকের আস্থাহীনতার বড় কারণ হিসেবে মনে করা যায়। এ ধরনের শ্লথ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ব্যাংক খাতে আমানতকারীদের আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সরকার যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, এটাই প্রত্যাশা।

Read more — সম্পাদকীয়
← Home