বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬

অবৈধ ভবন নির্মাণ, হুমকিতে ৩০০ বছর বয়সী ‘বায়েজিদ বোস্তামী’ কাছিম

উত্তরা ডেস্ক ২৩ আগস্ট ২০২৫, ০৬:৩২ অপরাহ্ণ
অবৈধ ভবন নির্মাণ, হুমকিতে ৩০০ বছর বয়সী ‘বায়েজিদ বোস্তামী’ কাছিম

চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারের পুকুরের তিনশত বছরের পুরোনো কাছিম (কচ্ছপ) রয়েছে। মাজার জেয়ারত ও কাছিম দেখতে প্রতিদিন হাজারো মানুষের আগমন ঘটে। এতো বড় কাছিম দেশের আর কোথাও নেই। কাছিমের আবাসস্থল পুকুরের পূর্ব পাড়। সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন স্থাপনা। যা কাছিমের জন্য বড়ই হুমকির বিষয়।

জানা গেছে, 'পরিবেশবাদীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারের পুকুরের পূর্ব পাড়ে কোনো স্থাপনা নির্মাণ নিষেধ করেছিলেন হাইকোর্ট। প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে ওই পাড়টি কাছিমের জন্য আবাসস্থল হিসেবে অবমুক্ত ছিল। কিন্তু সম্প্রতি হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করে বিপন্ন 'বায়েজিদ বোস্তামী' কাছিমের আবাসস্থল দখল করে ভবন নির্মাণ করছে মাজারের পরিচালনা কমিটি। যা হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।'

সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের ষোলশহর ২নং গেইট থেকে অক্সিজেন মোড় যাওয়ার পথে হাতের পশ্চিম পাশে বায়ে জিদ মাজারের গেইট। গেইট দিয়ে প্রবেশ করলে বাম পাশে বিশাল পুকুর। গেইটের সঙ্গে পুকুরের পূর্ব-উত্তর কোণায় টিনের ঘেরা দিয়ে সপ্তাহ খানেক ধরে পাকা ভবন নির্মাণের কাজ করছে ৮-১০ জন নির্মাণ শ্রমিক।

সেখানে ঢুকে কারা কাজ করছে জানতে চাইলে আবুল বশর নামে এক শ্রমিক জানান, 'কমিটির নির্দেশনায় একটি ভাতের হোটেল দেওয়ার জন্য কাজ করা হচ্ছে। গেইটের সঙ্গে আগের দুইতলা বিশিষ্ট একটি ভবন থাকলেও ওই ভবনের সংস্কার কাজ চলছে। ভবনের সঙ্গে দক্ষিণ পাশে ও পশ্চিম পাশে দেওয়াল দিয়ে করা হচ্ছে নতুন স্থাপনা। ওই হোটেল চালু হলে ধোঁয়া আর হোটেলের আবর্জনা পুকুরে পড়লে কাছিমের মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।'

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, 'মাজারের মতোয়াল্লী হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে 'কাচ্চি ডাইন' এর শোরুম খোলার জন্য এই স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। কাচ্চি ডাইনকে ওই দ্বিতলা বিশিষ্ট ভবন ভাড়া দেওয়া হলেও সেখানে করা হচ্ছে তৃতীয় তলা। যার অনুমোদনও নেই।'

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাজারের পুকুরের কাছিমের আবাসস্থল বোস্তামী পুকুর রক্ষায় ২০১২ সালে হাইকোর্টে রিট মামলা (৪৮৭১/২০১২) করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলা। ওই মামলায় বায়েজিদ পুকুর, পুকুরপাড় ও সংলগ্ন এলাকাকে কাছিমের আবাসস্থল ও প্রজনন ক্ষেত্র হিসাবে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা নির্দেশনা দেন। উক্ত মামলায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র, গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগের সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ বন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, মাজারের মতোয়াল্লী ও জেএমজি হোল্ডিংয়ের চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়। হাইকোর্ট আদেশ দেওয়ার ১৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনো মাজার পুকুর, পুকুরপাড় ও তৎসংলগ্ন এলাকায় কাছিমের আবাসস্থল গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সেই সঙ্গে এলাকাটিকে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে আদালতকে জানানোর নির্দেশও বাস্তবায়ন করা হয়নি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান ড. মনজুরুল কিবরিয়া  বলেন, বায়েজিদের পুকুরের মতো কাছিম- দেশের কোথাও নেই। এ কাছিমের রৌদ্রস্নান প্রয়োজন। এরা নিরিবিলি পরিবেশে পুকুরের পাড়ে ডিম পাড়ে আবার ডিমকে তাঁ দেয়। এদের জন্য বায়েজিদের পুকুরের পূর্ব পাড়টি খুবই প্রয়োজন। ওই পাড়ে স্থাপনা নির্মাণ উচিত নয়। এতে কাছিমের আবাসস্থল ধ্বংস হবে। বিপন্ন এ প্রাণীটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।'

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলার নেটওয়ার্ক মেম্বার আলীউর রহমান বলেন, '২০১০ সাল থেকে আমরা বায়েজিদ পুকুর ও কাছিম রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন করে আসছি। আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ভবন নির্মাণ করাটা আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর মতো। ভবন নির্মাণ বন্ধ করে স্থানটি পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনা না হলে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

২০০২ সালে জাতিসংঘের পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ কর্তৃক বোস্তামী কাছিমকে চরমভাবে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল—১ অনুযায়ী এ প্রজাতিটি চরম বিপন্ন প্রাণী হিসেবে সংরক্ষিত।

বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার স্থানীয় রেজাউল করীম রাজা বলেন, কাছিমের আবাসস্থল ধ্বংস করে নির্মাণ করা হচ্ছে ভবন। মাজার কমিটি হোটেলকে ভাড়া দিয়েছে। চারপাশে দেওয়াল দিয়ে বড় করা হচ্ছে হোটেলটি। দেওয়াল তৈরি হয়ে গেছে। আমরা এ বিষয়ে হাটহাজারী উপজেলা এসিল্যান্ড শাহেদ আরমানকে জানিয়েছি। তিনি তাৎক্ষণিক কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কাজ চলমান রেখেছে নির্মাণকারীরা।'

হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করে স্থাপনা নির্মাণ বিষয়ে জানতে চাইলে বায়েজিদ মাজারের মতোয়াল্লী হাবিবুর রহমান বলেন, 'নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। চারপাশে দেয়াল দিয়ে হোটেলে গোডাউন তৈরি করতে চেয়েছিলেন হোটেল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষে বাঁধা আসায় তা বন্ধ রাখা হয়েছে।'

তবে যেটুকু স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে তা ভেঙে ফেলা হবে কি-না জানতে চাইলে তিনি চুপ থাকেন।

হাটহাজারী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহেদ আরমান  বলেন, আমরা খবর পাওয়ার পর ওই পুকুর পাড়ের স্থাপনা বন্ধ করে দিয়েছি। তবে ওখানে কিছু স্থাপনা বা দেওয়াল নির্মাণ করে ফেলেছিল- সেগুলোর ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনা যেভাবে আসে সেভাবে পালন করা হবে। যদিও হাইকোর্টের একটি আদেশ অমান্য করেছিল মাজার কমিটি। সেক্ষেত্রে হাইকোর্ট ব্যবস্থা নিতে পারে।

প্রসঙ্গত, সুলতান উল আরেফীন হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (র.) এর আস্তানা চট্টগ্রামের বায়েজিদের একটি পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। ইরানের বিখ্যাত পার্সিয়ান সুফি বায়েজিদ বোস্তামীর নামে গড়ে উঠা এই মাজার চট্টগ্রামের ধর্মপ্রাণ মানুষের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্যও একটি অত্যন্ত আকর্ষনীয় স্থান। এ মাজারের পুকুরে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অত্যন্ত বিরল এবং বিপন্নপ্রায় কচ্ছপ বা কাছিম। বর্তমানে বায়েজিদ বোস্তামির মাজার ছাড়া এসব কচ্ছপ বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না। তাই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য খুব আকর্ষনীয় এ কচ্ছপ। ভক্তরা কাছিমকে খাবার দেন, কেউ কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।

 

Read more — সারাদেশ
← Home