বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬

অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক অপরিহার্য

নিজস্ব প্রতিবেদক ২২ অক্টোবর ২০২৫, ১২:২৬ অপরাহ্ণ
অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক অপরিহার্য

বিগত সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অলিগার্ক তৈরি হয়েছিল। সব অলিগার্কের একটি অভিন্ন চরিত্র ছিল, তারা ব্যাংক ঋণের অপব্যবহার করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান করা অপরিহার্য। এই স্বাধীনতা দিতে হবে আর্থিক, প্রশাসনিক ও কাঠামোগত। 

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে হোটেল আমারিতে ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার অপরিহার্যতা’ শীর্ষক এক আলোচনায় বিশিষ্টজন এসব কথা বলেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) এ আলোচনার আয়োজন করে। পিআরআইর ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ এতে সভাপতিত্ব করেন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এখানে সংস্কার, ওখানে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। তবে দেশের এই অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা অপরিহার্য। বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বায়ত্তশাসন দিলে হবে না, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান করতে হবে। বিএনপি সরকারে থাকতে রাজনৈতিক বিবেচনায় কখনও এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ হয়নি। বিএনপির সময়ে অর্থমন্ত্রণালয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তা আবার ফিরিয়ে আনা হয়। বিএনপির সময় শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিসহ কোনো প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগ হয়নি। ২০০৩ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংস্কার পরবর্তী সময়ে অর্থনীতিতে সুবিধা দিয়েছে। আর্থিক খাতে সংস্কারের সবই হয়েছে বিএনপির সময়ে।

আমীর খসরু বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা দিতে হলে সব দিক থেকেই দিতে হবে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় গভর্নর, ডেপুটি গভর্নরের নিয়োগ দিতে হবে। একই সঙ্গে আর্থিক, কাঠামোগত, আইনি, লোকবল নিয়োগ সবই স্বাধীনভাবে করতে হবে। আবার তাদের জবাবদিহি থাকতে হবে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে ১৮ মাসে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে করবে বলেও জানান তিনি। 

আলোচনায় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিগত সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। নিয়ম না মেনে ঋণ, সুদহারে সীমা আরোপ, ডলারের দর ধরে রাখা ও টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। এ থেকে উত্তরণে স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক দরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীন করার আইন প্রস্তাব করা হয়েছে। পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে এটি বাস্তবায়ন করতে হবে।

অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য আংশিক নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীন থাকলে কৃত্রিমভাবে ডলারের দর ধরে রাখার পর একবারে ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধির ধাক্কা নিতে হতো না। বিশ্বের কোনো দেশে সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বলে কিছু নেই। এটিকে অবশ্যই বিলুপ্ত করতে হবে। 

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অলিগার্ক তৈরি হয়েছিল। সব অলিগার্কই ব্যাংক ঋণের অপব্যবহার করেছে। যে কারণে এখন দেশের খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশের মতো। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আর্থিক, প্রশাসনিক, ব্যক্তি ও কাঠামোগত স্বাধীনতা দিতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার।

বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো ব্যাংক হয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় ব্যাংক হয়েছে। তবে দেশে ভালো মুনাফা করলে একমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংক করছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আগের সরকারের সময়ে টাকা ছাপানো হয়েছিল। এখনও ছাপানো হচ্ছে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

মূল প্রবন্ধে পিআরআইর প্রিন্সিপাল ইকোনমিস্ট ড. আশিকুর রহমান বলেন, যে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যত স্বাধীন ওই দেশের মূল্যস্ফীতি তত কম। তাদের প্রবৃদ্ধিও তত স্থিতিশীল। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নানা বিষয় চাপিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্ববাজারে সুদহার বাড়ার মধ্যেও আমরা ৬/৯ এর মধ্যে আটকে ছিলাম। ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের জন্য আইএমএফের কাছে যাচ্ছি। অথচ ১৮-২০ বিলিয়ন ডলার পাচার ঠেকাতে পারছি না।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আক্তার হোসেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি চিফ রিস্ক অফিসার এনামুল হক প্রমুখ।

Read more — অর্থনীতি
← Home