সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬

এল নিনোর প্রভাবে বাড়তে পারে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যুঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৯ অপরাহ্ণ
এল নিনোর প্রভাবে বাড়তে পারে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যুঝুঁকি

চলতি বছরের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, দাবানল ও পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এর প্রভাবে আগামী কয়েক মাসে অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব।

বুধবার প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক বছরের তুলনায় চলতি বছরের জুন থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত এল নিনোর কারণে অতিরিক্ত এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে।

গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো। এসব দেশের অনেক মানুষ এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের মতো নানা সমস্যার মধ্যে রয়েছে। তুলনামূলক উষ্ণ ও দরিদ্র অঞ্চলে তাপমাত্রা আরও কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেলে মানুষের জন্য ঝুঁকি বহুগুণ বাড়তে পারে।

গবেষণার সহলেখক এবং ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ফেব্রুয়ারি নাগাদ এল নিনোর প্রভাব কমে যাওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত গরমের প্রভাব এর পরও থাকতে পারে। এমনকি আগামী বছরের গ্রীষ্ম পর্যন্ত এর প্রভাব অনুভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, আগে থেকেই উষ্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য তাপমাত্রার সামান্য অতিরিক্ত বৃদ্ধিও জীবনহানির ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। ধনী দেশগুলোতে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা তুলনামূলক বেশি থাকায় এসব দেশের মানুষ কিছুটা বেশি সুরক্ষা পেয়ে থাকে।

গবেষণায় বিশ্বের ২৪ হাজারের বেশি অঞ্চলের স্থানীয় তাপমাত্রার পূর্বাভাস এবং তাপমাত্রার সঙ্গে মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গত তিন দশকের গড় তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুহারের সঙ্গে ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত সম্ভাব্য মৃত্যুহার তুলনা করে অতিরিক্ত প্রাণহানির হিসাব করা হয়েছে।

গবেষণায় আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে অবস্থিত শুষ্ক সাহেল অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন এলাকাকেও উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রাখা হয়েছে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ হাজার ৩০০, ভারতে ১৫ হাজার ৮০০ এবং ব্রাজিলে ১৩ হাজার ৩০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে।

সম্ভাব্য প্রাণহানি কমাতে দাবদাহের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, শীতলীকরণ কেন্দ্র, বিনামূল্যে খাবার পানির ব্যবস্থা এবং খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছেন গবেষকরা। পাশাপাশি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বয়স্ক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষদের বিশেষ নজরদারিতে রাখার কথাও বলা হয়েছে।

চরম তাপমাত্রা দেখা দেওয়ার আগেই জরুরি অর্থ ও প্রয়োজনীয় সম্পদ প্রস্তুত রাখার জন্য ‘পূর্বাভাসভিত্তিক অর্থায়ন’ ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অভিযন্ত তিওয়ারির মতে, গবেষণাটিকে আতঙ্ক তৈরির কারণ হিসেবে না দেখে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র হলেও মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা আগে থেকেই বাড়ছে। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হওয়ায় চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের হিসাবে, এল নিনোর সময়ে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিক বছরের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চরম তাপদাহের দিন ৪৪ শতাংশ বাড়তে পারে। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর আবহাওয়া কোন দিকে যেতে পারে, চলতি এল নিনোর পরিস্থিতি তার একটি ইঙ্গিতও দিচ্ছে। সূত্র: এপি।

Read more — আন্তর্জাতিক
← Home